আমরা কি তাহলে সত্যিই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছি ? (পৃথিবীর বড় পাঁচটি গণবিলুপ্তি)

সুপ্রিয় পাঠক কেমন আছেন সবাই? এই পৃথিবীতে অনেকবার নানা করণবসত জীবমন্ডলে একটা বড় ধরনের অংশ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্তির ৫টির মধ্যে ক্রেটেশাস-টার্শিয়ারী (কে-টি) বিলুপ্তিই সর্বাধিক পরিচিত কারণ এর ফলে ডাইনোসর নামের বিশালাকার প্রাণীগুলো নিম্চিহ্ন হয়ে যায়। পৃথিবীর ইতিহাসের সেই নির্দিষ্ট সময়কালগুলো যখন পৃথিবীর মোট জীব-বৈচিত্র্যের একটা বড় অংশ সেই সময় সীমার মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায়। এদের মধ্যে পারমিয়ান সময়ের (প্রায় ২৫১ মিলিয়ন বছর আগে) বিলুপ্তিই ধরা হয় সবচেয়ে মারাত্মক কারণ তখন পৃথিবীর মোট জীব প্রজাতির ৯৬% প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলো!  আসুন দেখে নেই কখন-কেন ঘটেছিলো সেই বিলুপ্তিগুলো:

অরডোভিশিয়ান-সেলুরিয়ান বিলুপ্তিকাল (৫০০-৪০৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে): এই বিলুপ্তিকে ধরা পৃথিবীর ইতিহাসে তৃতীয় বৃহত্তম বিলুপ্তি। এই বিলুপ্তি দুটি আলাদা সময়কালে বিভক্ত। এসময়ে পৃথিবীর বেশিরভাগ জীবন ছিলো জলজ। তাই বিলুপ্ত প্রজাতিগুলোর বেশিরভাগ ছিল পানিতে বসবাসকারী জীব, যেমন-ট্রিলোবাইটস, ব্রাকিওপোডস এবং গ্রাপটোলাইটস। এ সময় পৃথিবীর মোট প্রজাতির ৬০%-৭০% প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এ বিলুপ্তির কারণ হিসেবে ধারণা করা হয়-তুষার যুগের সূত্রপাত, জলজ জীবনসমূহের বিভিন্ন ধরণের অনিয়ম ও তার প্রত্যাবৃত্তি, পৃথিবীর গঠণ ও অন্যান্য আভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপের ফলে সৃষ্ট নানা বায়ুমন্ডলীয় ও রাসায়নিক পরিবর্তন, অতিমাত্রায় কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ।

লেইট ডেভোনিয়ান বিলুপ্তিকাল (৪০৫-৩৪৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে): এ সময়কালটাতে পৃথিবীর সকল জীব প্রজাতির তিন-চতুর্থাংশ মারা যায়। এ সময়কার বিলুপ্তিটি ঘটে মিলিয়ন বছরের ধারাবাহিকতায়। এসময় গভীর জলের জীব প্রজাতিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রবাল প্রাচীরগুলো ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেগুলো প্রায় ১০০ মিলিয়ন বছর পর নতুন প্রজাতির কোরাল উদ্ভবের আগ পর্যন্ত আর আগের রূপে ফিরে আসেনি। এখানেও চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার আর্বিভাবই মূলত বিলুপ্তির প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়। তীব্র শৈত্য, কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ অতিমাত্রায় কমে যাওয়াও অন্যতম প্রধান কারণ।

পারমিয়ান গণবিলুপ্তি (২৮০-২৩০ মিলিয়ন বছর পূর্বে): পারমিয়ান বিলুপ্তির ডাকা হয় ‘দ্য গ্রেট ডাইং’ বলে। কারণ এসময় পৃথিবীর সকল প্রজাতির ৯৬% ই বিলুপ্ত হয়ে যায়। পৃথিবীকে প্রাণশূন্য করে দেবার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলো। আমাদের এখনকার চারপাশের নানা জীববৈচিত্র বাকি অবশিষ্ট ৪% এর ফসল। কারণ হিসেবে ধারণা করা হয়- সাইবেরিয়ান আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, পৃথিবীর উষ্ণায়ন, গভীর সমুদ্র তলে বিষাক্ত পানির প্রবাহ, সেই সাথে উল্কাখন্ডকে দায়ি করা হলেও সেটা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ।

ট্রায়াসিক-জুরাসিক গণবিলুপ্তি (২৩০-১৩৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে): এই গণবিলুপ্তির প্রথম অংশ ট্রায়াসিক বিলুপ্তি যার সময়কাল ২৩০-১৯০ মিলিয়ন খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং পরবর্তী অংশ জুরাসিক গণবিলুপ্তি যার সময়কাল ১৯০-১৩৫ মিলিয়ন খ্রিস্টপূর্বাব্দ। জলবায়ুর পরিবর্তন, অগ্ন্যুৎপাত এবং সেই সাথে উল্কাখন্ডের আঘাতকে এই বিলুপ্তির কারণ হিসেবে দায়ি করা হয়।

ক্রেটেশিয়াস-টার্শিয়ারি বিলুপ্তিকাল (১৩৫-২ মিলিয়ন বছর পূর্বে): ক্রেটেশিয়াস সময়কালটি ১৩৫-৬৫ মিলিয়ন বছর এবং টার্শিয়ারী বিলুপ্তিকালটি ৬৫-২ মিলিয়ন বছর পূর্বে ঘটে। এ বিলুপ্তির ঘটনাটি সর্বাধিক পরিচিত ডাইনোসর নামক প্রাণীর বিলুপ্তির কারণে। শুধু ডাইনোসরই নয় অন্যান্য আরো বহু প্রজাতিই বিলুপ্ত হয়ে যায় এ সময়কালে। জুরাসিক কালের একেবারে শেষ সময়ে পতিত উল্কাখন্ডের প্রভাবকেই এজন্য দায়ি করা হয়।

আমরা আরেকটি বিলুপ্তির কতটুকু কাছে দাঁড়িয়ে আছি? কিছু বিজ্ঞানীরা বলছেন এটা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, আমরা ষষ্ট বিলুপ্তি প্রক্রিয়ার মাঝেই আছি। প্রতি ঘণ্টায় তিনটি প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে যা বছর শেষে ত্রিশ হাজারে গিয়ে দাঁড়ায়। আশংকার কথা হচ্ছে যে, এই হারিয়ে যাওয়ার হার ক্রমশ বেড়েই চলছে। বর্তমানে অর্ধেক উভচর, স্তন্যপায়ীদের এক চতুর্থাংশ এবং প্রবাল প্রাচীরের এক তৃতীয়াংশ বিলুপ্তির মুখে দাড়িয়ে।

কেন এমন হচ্ছে? অতীতে আবহাওয়া পরিবর্তন বা টেকটনিক প্লেটের স্থান চ্যুতি সেই সব বিলুপ্তির কারণ ছিল। ডাইনোসরের ক্ষেত্রে হয়তো উল্কা পতনই দায়ী। কিন্তু বেশীরভাগ বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন বর্তমান সংকটের একমাত্র কারণ: মানুষ। বেশীরভাগ প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবেশের উপর লাগাতার অত্যাচার এবং পরিবেশ দূষণই দায়ী।  মে, ২০১৪ এ প্রকাশিত ডিউক ইউনিভার্সিটির একটি রিপোর্টে দেখা যায় মানুষের বিবিধ কর্মকাণ্ড বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্তিকে এক হাজার গুণ বেশী দ্রুততর করেছে।

বিলুপ্তি নিয়ে লেখা ভয়ঙ্কর অ্যাডভেঞ্চার একটা উপন্যাস পড়তে চাইলে দেখে নিতে পারেন জেমস রোলিন্স এর বই দ্য সিক্সথ এক্সটিঙ্কশন এর বাংলা অনুবাদ (বাতিঘর প্রকাশনী – বইমেলা ২০১৬)।

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *